28 March- 2020 ।। ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ।। রাত ১:৫৫ ।। রবিবার

বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছিম ভাইকে খুব বেশি মনে পড়ে

ইমাম মেহেদী ||

জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান হল আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা। একাত্তর সালে আমাদের দেশের মানুষ বিভিন্নভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। এই যুদ্ধ ছিলো আমাদের দেশের সকল শ্রেণি মানুষের জন্য জনযুদ্ধ। যাদের সাহস, মেধা, প্রজ্ঞা, ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই লাল সবুজের বাংলাদেশ। আর সেই মানুষের মধ্যে প্রিয় একজন মানুষ বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছিম উদ্দিন আহম্মেদ।

সম্ভবত পরপর দুবারের নির্বাচিত কমান্ডার ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার।  কুষ্টিয়া জেলার খোদাদাদ খান রোডের বাসিন্দা প্রয়াত সুজা উদ্দিন আহমেদ ও প্রয়াত লুৎফুন নাহারের সুযোগ্য পুত্র ছিলেন নাছিম উদ্দিন আহম্মেদ। আমার কাছে নাছিম ভাই ছিলেন আমার একজন অভিভাবক। তার মেধা, কথা অনুকরণও করতাম যেন হয় মনের অজান্তেই। অনেক ¯েœহ করতেন। কয়েছেবছর দীর্ঘ সময় সাথে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। সম্ভবত ২০১২ সালে কোন এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই পরিচয় ঘটে। আমি তখন কুষ্টিয়া শহরে নিয়মিত সাংবাদিকতা করি। অনার্সের ছাত্র ছিলাম। দৈনিক আজকের আলো পত্রিকায় কাজ করতাম সম্ভব তারও আগে। অনেকদিন করেছিলাম দৈনিক দেশতথ্য পত্রিকায়। সক্রিয়ভাবে কাজ করতাম প্রথম আলোর পাঠক ফোরামের সংগঠন বন্ধুসভার। ছয় রাস্তার মোড়ে প্রথম আলোর অফিসে নাছিম ভাই মাঝে মাঝেই আসতেন কাগজপত্র ও পেনড্রাইভ নিয়ে। প্রথম আলোর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি তোহিদ ভাই ও আমার সঙ্গে গল্প করতেন। কিছু তথ্যও দিতেন। এরই মাঝে কোন এক তারিখে আমি যোগ দিলাম দৈনিক আরশীনগর পত্রিকায়। প্রায় প্রতিদিনই সন্ধ্যা বেলায় নাছিম ভাই মটর বাইকের পেছনে বসে আসতেন পত্রিকা অফিসে। আর মটর বাইক চালাতেন তারই বন্ধু শফিউদ্দিন রতন।  আমি তখন পুরোদমে গ্রামে গ্রামে বেড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার সংগ্রহ করতাম। বিশেষকরে ডিসেম্বর মাসে আমার আর নাছিম ভাইয়ের সংগযোগটা অতিমাত্রায় আপন হল। পত্রিকা অফিসে বসে অনেক গল্প হতো। ডিউ ভাবির হাতে বানানো চা নাস্তা খেতে খেতে আলাপ চলতো। ফটো সাংবাদিক বাদলের তোলা ছবি খারাপ হলে ভাই একটু রাগ করতেন বাদলকে। আর প্রতিদিনের কিছু কিছু অনুষ্ঠানের নিউজ সাধারণত আমিই করতাম হতো। কারণ পত্রিকার সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব ভাই দেখিয়ে দিয়েছিলেন, মানে নাছিম ভাইয়ের এ্যস্টিসট্যান্ট বানিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে।

২০১৩ সালের ২৯ মে আমি জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতায় অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর অফিসে একদিন নাছিম ভাই বলেছিলেন রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব ভাইকে, বিপ্লব তুমি ছেলে একটা পেয়েছো। আমি লুৎফর কমান্ডারের কাছ থেকে মেহেদীর খোঁজ নিয়েছি। লুৎফর তো মেহেদীর সেই ভক্ত।  এই অল্প বয়সে অনেক বড় প্রাপ্তি অর্জন করেছে ।

এরই মাঝে অগ্রণী ব্যাংকের সহযোগিতায় ‘স্বাধীনতা আমার অহংকার’ এর কাজের জন্য সমন্বয়ক হিসেবে নাছিম ভাই ঠিক করলেন আমাকে। প্রায় দুমাস ভরে আমি মাহমুদ, অন্তি, শুভ, শামীমা সুলতানা, কুসুম, শুভ, অমিত, সুরুজ, মিম, ¯িœগ্ধা, মারুফসহ আরো অনেকই মিলে কুষ্টিয়া শহরের জিলা স্কুল, গার্লস স্কুল, চাঁদসুলতানা, মীর মশাররফ হোসেন, দিনমনি, মোহিনী মোহন বিদ্যাপীঠ , মিলপাড়া মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের মোটিভেশন করতাম, মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতাম, কুইজ করতাম। এই কাজের জন্য তখন বীর মুক্তিযোদ্ধা তাইজাল আলী খান চাচা, হাজী রবিউলর কাছেও গিয়েছিলাম একবার অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনার জন্য। উক্ত দুইজনই  এরকম একটি অনুষ্ঠানের কথা জেনে প্রশংসা করেছিলেন। সহযোগিতা করতেন মুক্তিযোদ্ধা শাহাবুব আলী। স্বাধীনতা আমার অহংকার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে রাখার জন্য বারবার  চেষ্টা করেছিলেন মাহবুব উল আলম হানিফ এমপি মহোদয়কে রাখার জন্য। তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন, পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম অনুষ্ঠানে ছিলেন। কিন্তু সময় ও সুযোগ একসাথে না হওয়ার কারণে এমপি মহোদয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। অনুষ্ঠান হয়েছিলো ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪ তারিখে কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। কি সুন্দরভাবে কুইজ বিজয়ী কোমল শিক্ষার্থীদেরকে জাতীয় পতাকা বুকের উপর দিয়ে জড়িয়ে দিচ্ছিলেন। মনটা আনন্দে ভরে যাচ্ছিল। একজন মুক্তিযোদ্ধার দেশপ্রেম ও ভালোবাসার মূহুর্ত অনুভব বোধ করছিলাম আমরা। প্রায় দেড় ঘন্টা শিক্ষার্থীদেরকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনালেন তিনি। সবকাজের জন্য আমরা তখন বসতাম এনএস রোডের কারামা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের উপরে নাছিম ভাইয়ের অফিসে।

হঠাৎ জানতে পারলাম নাছিম ভাই না ফেরার দেশে। প্রতিটি মানুষের মৃত্যু অবধারিত কিন্তু স্মৃতি চিরকালীন অমর। নাছিম ভাইয়ের জন্য মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কতো স্মৃতি, কথা কথা- আজ এই এখানেই লেখার পর্ব শেষ করছি। নাছিম ভাইকে নিয়ে কি লেখার শেষ আছে, আরো লিখবো কাল, পরশু অথবা আগামীতে ।

 

ইমাম মেহেদী

সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক।

 

Sharing is caring!



এই বিভাগের আরো খবর...