25 November- 2020 ।। ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ।। সকাল ১০:৫৩ ।। বুধবার

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ গ্রন্থটি ইতিহাস নির্ভর সুখপাঠ্য

মো.রিয়াদ হোসেন : বইটি মোট ছয় অধ্যায়ে বিভক্ত। অধ্যায়গুলো হলো- শেখ মুজিবের প্রত্যাবর্তণ ও স্বদেশ নির্মাণ, যুদ্ধোত্তর পরিস্থিত, স্বদেশ নির্মাণের চ্যালেঞ্জ, স্বদেশ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় কুটনৈতিক তৎপরতা, পুনর্বাসন ও স্বদেশ নির্মাণ কার্যক্র, দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া, দ্বিতীয় বিপ্লব ও স্বদেশ নির্মাণের নতুন উদ্যম। তারপর গ্রন্থপঞ্জি সংযোজিত হয়েছে।

প্রথমে জনাব মোরশেদ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনকে দুইভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগ শেষ করেছেন স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আর দ্বিতীয় ভাগে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যার্তন থেকে শুরু করে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এ শেষ করেছেন। প্রথম পর্বকে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ অর্জন এবং দ্বিতীয় পর্বকে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ নিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের নানা অসত্য, অপপ্রচার, কুৎসা ও বানোয়াট তথ্যের ও জবাব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে তিনি দাবী করেছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুকে শুধু মাত্র একজন নেতা হিসেবে নয়, সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তুলে ধরারও চেষ্টা করেছেন জনাব হাসান মোরশেদ।

প্রথম অধ্যায়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে বন্ধী হন শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর গোটা মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কারাগারে বন্দি ছিলেন। এরপর ১৯৭১ সালের ৮ জানুয়ারি মুক্তি পাবার পর লন্ডনও দিল্লী হয়ে ১০ জানুয়ারি স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন পিতা মুজিব। দেশে ফিরেই তিনি পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখার প্রস্তাব নাকচ করে দেন। ভারতকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভারতীয় সেনাদের এদেশ থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করেন। দেশে ফেরার ১দিন পর অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারী করে সঙসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। ১২ জানুয়ারী শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহন করে ২৩ সদস্য বিশিষ্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন। লেখক এই বিষয়গুলোকে প্রথম অধ্যায়ে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর কারাগারে থাকাকালীন সময়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এর রিপোর্ট তুলে ধরেছেন। এছাড়া লন্ডনে শেখ মুজিব এবং বিট্রিশ প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে সাক্ষাতের বিষয়টিও এ অধ্যায়ে সংযোজিত হয়েছে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ে অধ্যায়ে লেখক যুদ্ধোত্তর পরিস্থতি তথা অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত এবং সার্বিক পরিস্থিতি ও স্বদেশ নির্মাণের চ্যালেঞ্জকে তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এক্ষেত্রে তিনি আওয়ামী লীগ ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দল, সংবাদপত্র, পেশাজীবীদের ভূমিকাও তুলে ধরেছেন এ অধ্যায়ে। মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ মুজিব সরকারের জন্যে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দুর্বল আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, পরাজিত পক্ষের ষড়যন্ত্র, দক্ষ জনবলের অভাব, আর্থিক অনটন, খাদ্য ঘাড়তি ইত্যাদি। ১২জানুয়ারি,১৯৭২ সালে তিনি যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তার মাত্র ২৬ দিন আগেই নতুন রাষ্ট্রটির জন্ম হয়। আর এসকল প্রতিবন্ধকতা বঙ্গবন্ধু’র সরকারকে মোকাবিলা করতে হয়েছে সকল ষড়যন্ত্রকে উর্ধ্বে রেখে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শুধু মানুষ হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তারা এবং তাদের সহযোগীরা মিলে নির্যাতন করেছে এদেশের সাড়ে চার লক্ষের অধিক মা – বোনদের। এছাড়া তারা হাজার হাজর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রাম, বাজারের পর বাজার সেই সাথে রেলপথ, সেতু, সড়ক, টেলিযোগাযোগ, মিল ও ফ্যাক্টরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন উৎপাদন তথা গোটা দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেয়। এসকল অভ্যন্তরীণ সমস্যার পাশাপাশি কুটনৈতিক সমস্যার ও সম্মুখীন হতে হয় বঙ্গবন্ধুর সরকারকে। এসকল সমস্যা সমাধানের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার কাজ করতে শুরু করেছে তখন এদেশের অন্য সব রাজনীতিবিদ, আমলাতন্ত্র, বুদ্ধিজীবী, সংবাদিকদের ভূমিকা সম্পর্কে জনাব মোরশেদ যে তথ্য প্রদান করেছেন, সেটি বইটিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন যে, বঙ্গবন্ধু মুক্তিবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সকল গ্রুপকে অস্ত্র জমাদানের আহ্বান জানালেও মাওপন্থী ও সর্বহারারা অস্ত্র প্রদান করেনি। এছাড়া শেখ মুজিবের বিশ্বস্ত মুজিব বাহিনীর একটি অংশ অস্ত্র জমা দেয়নি, তারাই পরবর্তীকালে জাসদ গঠন করে অরাজকতা শুরু করে। এছাড়া এই পর্বে জনাব মোরশেদ সর্বহারা পার্টি, গলাকাটা পার্টি, বিপ্লবী গণবাহিনী, বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’র অরাজকতা ও সরকার বিরোধী কর্মতৎপরতা তুলে ধরেছেন। এছাড়া লন্ডন থেকে প্রকাশিত পাকিস্তানপন্থী ‘সংগ্রাম’ ও ‘মুসলিম বাংলা’ র অপপ্রচার তুলে ধরেছেন তিনি।

তৃতীয়াংশে লেখক দেশ পুন:গঠনে জন্য কুটনৈতিক কর্মকান্ড তুলে ধরেছেন। এ অধ্যায়ে তিনি বাংলাদেশকে জাতিসংঘে অন্তর্ভুক্তি, সদস্যরাষ্ট্রসমূহের স্বীকৃতি প্রদান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাসমূহের সদস্যপদের প্রচেষ্টা, বিভিন্ন দেশের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। এছাড়া লেখক যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের বিচার, আটকে পড়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনা, বিহারিদের ফিরিয়ে দেওয়া এবং পাকিস্তানের সাথে সম্পদ ভাগাভাগির বিষয়টিও এ অধ্যায়ে আলোকপাত করা করেছেন।

১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত ও ৭ ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করার পর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত মোট ৩৪টি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সুসম্পর্ক রেখে তিনি জোটনিরপেক্ষ থাকবেন এবং পৃথিবীর সবথেকে বেশি খাদ্য উৎপাদনকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক স্থাপন করেন। এ বছরের ১মার্চ বঙ্গবন্ধু সোভিয়েত সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে পাঁচ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মস্কো যান এবং সেখানে ৩ মার্চ ‘মুজিব – কোসিগিন’ চুক্তিতে আবদ্ধ হয় দুইদেশ। এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের পুনর্বাসন ও পুনর্গঠন তৎপরতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য – সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি উল্লেখ করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ৫৩তম জন্মদিনে ইন্দরা গান্ধী ঢাকাতে আসেন এবং ১৯ মার্চ পঁচিশ বছর মেয়াদি শান্তি, সহযোগিতা ও মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ১৯৭৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু জোট নিরপেক্ষ সম্মলনে আলজেরিয়াতে যান। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত – শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে’। এ সম্মেলনে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট গাদ্দাফি ও সৌদি বাদশাহ ফয়সালের সাথে দেখা হয়। তারা মুজিবকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পরিবর্তে ইসলামি প্রজাতন্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের প্রস্তাব দিলে মুজিব বলেন, ‘ সব ধর্মের মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ আর্জিত হয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র নয়, বরং গণপ্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ টিকে থাকবে তার ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাচেতনা ও ঐতিহ্য নিয়ে।’ ১৯৭৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘসহ প্রায় ২৭ টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন করতে সক্ষম হয়।

চতুর্থ অধ্যায়ে হাসান মোরশেদ এর বইয়ের নাম করণের সার্থকতা খুজে পাই বইয়ের এ অধ্যায়টি পড়ে। এ অধ্যায়ে তিনি পুনর্বাসন ও দেশ পুনঃগঠনের কার্যক্রম নিয়ে খুব সংক্ষেপে তথ্যবহুল আলোচনা করেছেন। তিনি এখানে পুনর্বাসন বলতে শুধু মাত্র ভারতে প্রত্যাগত শরণার্থীদের পুনর্বাসন, গৃহহীন জনসাধারণের পুনর্বাসনকেও বুঝিয়েছেন। অন্যদিকে দেশ পুনর্গঠনের কার্যক্রমের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, অত্যাচারিত নারীদের পুনর্বাসন, সমুদ্র ও নদীবন্দর পুনঃপ্রতিষ্ঠ, রাস্তাঘাট – ব্রীজ- রেললাইন পুননির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিলো। এ ছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত কৃষি ও শিল্প খাত পুনর্গঠন, উৎপাদন প্রক্রিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভূমি সংস্কার এবং সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও স্পষ্টত হয়েছে উক্ত অধ্যায়ে।

হাসান মোরশেদ তাঁর বইয়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে প্রথমেই উল্লেখ করেছেন এককোটি শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং ৪৩ লক্ষ বাসগৃহ নির্মাণ করার বিষয়টি। এছাড়া যুদ্ধের কারণে গৃহহীন দুস্থ মানুষদের পুনর্বাসন, তাদের জমি, খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করাও ছিল সরকারের গুরু দায়িত্ব। প্রথমেই প্রশাসনিক নির্দেশে এবং নিম্নতম পর্যায়ে পর্যন্ত রাজনৈতিক সংগঠন সৃষ্টি করে এই সমস্যা মোকাবিলার ব্যবস্থা করা হয়। ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সংগঠিত ও পরিচালনার লক্ষ্যে তৎকালীন ত্রাণবিষয়ক মন্ত্রী কামারুজ্জামান ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি গ্রাম থেকে শুরু করু করে জেলা পর্যায়ে ত্রাণ কমিটি গঠনের রূপরেখা প্রণয়ন করেন। গ্রামের আয়তন ও লোকসংখ্যার ভিত্তিতে ৫ থেকে ১০ সদস্যের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি গঠন করা হয় যা ত্রাণ কমিটি নামে পরিচিত হয়। স্থানীয় নেতারা, শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা এবং স্থানীয় কর্মীদের মধ্য থেকে জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা এ কমিটির সদস্যদের নিয়োগ করে। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে ইউনিয়ন, থানা এবং মহকুমাতে কমিটি গঠন করা হয়। পুনর্বাসনের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের জুন মাস পর্যপ্ত ছয় মাসের জন্য ১০৭ কোটি টাকার একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় এবং এতে দুই কোটি স্থানচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন ও অন্নসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এছাড়া প্রথম ছয়মাসে টেস্ট রিলিফের ১৭ কোটি টাকায় ২ কোটি ৩০ লাখ লোক এবং ২৫.৭৫ লাখ একর জমিতে কৃষি উৎপাদন উপকৃত হয়। এছাড়া ৭১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে গৃহ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিবিধ সমস্যা প্রভূত পরিমাণে সমাধান করতে সক্ষম হয়। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে ১ কোটি ৪১ লাখ ৮১ হাজার ৮৮৫ মণ খাদ্যশস্য ছাড়াও বিপুল পরিমাণ গুঁড়া দুধ, শিশুখাদ্য, তাঁবু, ত্রিপল ও শাড়ি বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। সহায়- সম্বলহারা মহিলা ও শিশুদের পরিচর্যা এবং নিরাপত্তার জন্য মহকুমা পর্যায়ে ৬২ টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।

১৯৭২ সালের জুন মাস থেকে দেশপুনর্গঠনের দ্বিতীয় পর্যায়ে বলে অভিহিত করেছেন লেখক। এ সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন, কৃষি এবং বিদ্যুৎ ও শিল্পব্যবস্থা যথাশিগগির স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করা হয়। প্রথমত পরিবহন ব্যবস্থা বিধ্বস্ত হওয়ার ফলে যুদ্ধোত্তর অর্থনীতি প্রায় অচল হয়ে পড়ে। পরিবহন কাজের জন্য বন্দরের সকল ধরেরর সুযোগ সুবিধা বিধান করা হয়, নৌ পরিবহন উন্নয়ন এবং অন্যান্য খাতের ওপর সমগুরুত্ব আরোপ করা হয়। ৮২টি রেলব্রিজ স্থানীভাবে এবং ১৯৮ টি রেলব্রিজ অস্থায়ীভাবে পুননির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২৭৪টি বিধ্বস্ত সড়ক সেতুর মধ্যে ৫৫টি সেতু স্থায়ীভাবে মেরামত করা হয় এবং ৯৬ টি সাময়িক ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হয়। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানসমূহ মেরামত ছাড়াও বিদেশ থেকে বার্জ, নৌকা, টাগবোট প্রভৃতি জরুরি ভিত্তিতে আনায়ন এবং অবতরণস্থল ও ওয়ার্কশপ তৈরি করা হয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য সরকার প্রথম বছরেই ৬১টি লাইন মেরামত করা ছাড়াও ২৪টি লুপ লাইন নির্মাণ এবং ১৬টি ক্ষতিগ্রস্ত লাইনকে কর্মক্ষম করে তোলা হয়। লেখক কৃষিখাতের ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু সরকারের কৃষিক্ষেত্রে নতুন যান্ত্রিক পদ্ধতির পারবর্তন সহ অন্যান্য পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেছেন। কৃষিক্ষেত্রে তিনি সমবায় পদ্ধতিকে সবসময়ে প্রাধান্য দিতেন। বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময়েই বাংলাদেশের দুগ্ধ উৎপাদনকারীদের সমবায় ইউনিয়ন ‘মিল্ক ভিটা’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী পাঁচবছর দেশের প্রতিটি গ্রামে বাধ্যতামূলক সমবায় চালু করার ঘোষণা দেন। লেখক মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে শিল্পক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দেখিয়েছেন ৪০ কোটি ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা যা কাঁচামাল,বস্তুগত অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির দাম হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য ১৯৭২-৭৩ সালর শিল্প উৎপাদনের লক্ষংমাত্রা স্থির করা হয় ৫৭৩কোটি ৮১ লাখ টাকা। বঙ্গবন্ধু সরকার জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে সহযোগিতার জন্য ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ পরমাণু কমিশন গঠন করে। এছাড়া খাদ্যচাহিদা পূরণের জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গড়ে তোলা হয়। বিজ্ঞান একাডেমি গড়ে তোলার মাধ্যমে তাত্ত্বিক ও ফলিত বিষয়াবলীতে গবেষণায় উদ্ধুদ্ধ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। মাত্র দেড় বছরে ২০,৪৩০ জন স্বেচ্ছাসেবীকে প্রশিক্ষণ প্রদান, শতশত বহৃতল বিশিষ্ট আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং ১৫ মিটার উঁচু ১৩৭টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ সম্ভব হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের জন্য বরাদ্দ করা হঢ নগদ টাকার তহবিল। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধে শহিদ পরিবারগুলোকে প্রধানমন্ত্রীর তহবিল হতে এককালীন সাহায্য মঞ্জুর করা হয়। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ভারত ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করানো হয়। নির্যাতিত নারীদের দায়িত্ব শেখ মুজিবুর রহমান নিয়ে তাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তাঁদের জন্য বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড গঠন করা হয়। এ বোর্ডের অধীনে তাঁদের স্বাবলম্বী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। লেখক তাঁর বইয়ে যুদ্ধ শিশুদের দত্তক গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেছেন সচেতনতার সাথে। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের এ দেশীয় শাখাকে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ এ রূপান্তরিত করা হয়। ৩০ মে ১৯৭২ সালর কাঁচা পাটের রপ্তানি জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৭ জুন ১৯৭২ পাট কর্পোরেশন গঠন করা হয়। ভোগ্যপণ্যের মূল্য হ্রাসের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী ইউনিয়ন পর্যায়ে নায্যমূল্যের দোকান খোলা হয়। ৩০জুন ১৯৭২ সালে ‘পুনর্গঠন বাজেট’ প্রদান করা হয়। সে বাজেটে নতুন করে কর আরোপ করা হয়নি এমনকি রেলে যাত্রী বা মালের ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়নি। উপরুন্ত ১৪ এপ্রিল ১৯৭২ পর্যন্ত সকল ধরনের বকেয়া ভাড়া এবং সুদ মওকুফ করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশ শিল্প ঋণ সংস্থাও গঠন করা হয় অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য। ১৯৭২ সালের ২৫ মার্চ পাট, বস্ত্র ও চিনিকলসমূহ, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান সমূহ জাতীয়করণ করে আইন পাশ করে এবং এর মাধ্যমে দেশের ৮০-৮৫ শতাংশ শিল্প, ব্যাংক ও বীমা সরকারি নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনূর্ধ্ব ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মওকুফ করা হয়৷ এতে পরিবার প্রতি সর্বাধিক ১০০ বিঘা পর্যন্ত জমির মালিকানা সিলিং নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কৃষিঋণ বাতিল করে ৬৮ লাখ সার্টিফিকেট মামলা বাতিল করে দেওয়া হয়। লবণের ওপর আরোপিত আবগারি শুল্কও প্রত্যাহার করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ তুলে ধরে লেখক বিস্তার আলোচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু সরকার শিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুততম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য শুরুতে ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করে। ১৯৭২ সালেই বাংলা একাডেমি আদেশ জারী করা হয় এবং বাংলা উন্নয়ন বোর্ডকে এটির সাথে সংযুক্ত করা হয়। আসন সংকট দেখা দেওয়ায় কলেজগুলোতে শিফট চালু করা হয়৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৭০০০ শিক্ষকের চারি জাতীয়করণ করা হয়। এছাড়া জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে জোর দেওয়া হয়। উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন গঠন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, কারিগরি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করে বঙ্গবন্ধু সরকার যা বিস্তার আলোচনা করছেন লেখক এ গ্রন্থে। যুদ্ধপরবর্তীকালে বঙ্গবন্ধু সরকারের বড় অর্জন হলো দেশের শাসনতন্ত্র তৈরি করা। দেশ স্বাধীনের মাত্র ১১ মাসের মাথায় জাতিকে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল ও প্রায় নিখুঁত সংবিধান প্রদান করতে সক্ষম হন।

মুক্তিযুদ্ধের পর মুজিব সরকারের জন্য বড় সমস্যা ছিল আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা। লেখক এ বিষয়ে চমকপ্রদ তথ্য উপস্থাপন করছেন। তিনি তাজউদ্দীন আহমদের জাতীয় মিলিশিয়া এবং রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছেন। এছাড়া মওদুদ আহমেদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন বিডিআর এ রক্ষীবাহিনীর মধ্যে পিএখানা চত্বরে গোলাগুলি হয় মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে এবং শেখ মুজিব নিজে পিলখানাতে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। তবে একথা সত্যযে, বাহাত্তরের মাঝামাঝি থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত মুজিব বিরোধী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং ক্রিয়াশীল। উল্লেখ্য, লেখক এখানে বিভিন্ন পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়ে বিষয়গুলো সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। মুজিব সরকারের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিকীকরণ থেকে উন্নত হওয়ার প্রক্রিয়াটি দুঃখজনকভাবে ব্যাহত হয় গোপন রাজনৈতিক দলগুলোর সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের কারণে। ১৯৭৪ সালে মাওলানা ভাসানী ও জাসদের জলিল রবসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার এবং ডিসেম্বরে জরুরি আইন ঘোষণার করে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে চরম অ্যাকশন ও পুলিশের গুলিতে সিরাজ সিকদার নিহত হলে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কমে যায় বলে লেখক দাবি করেছেন।

পঞ্চম অধ্যায়ে এ অধ্যায়ে হাসান মোরশেদ ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে বঙ্গবন্ধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এ দুর্ভিক্ষে বঙ্গবন্ধু ঐকান্তিকতা, মানবিকতা ও নিরলস কর্মপ্রচেষ্টায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে নূন্যতম ক্ষতি স্বীকার করে এ দুর্ভিক্ষাবস্থা থেকে কাটিয়ে ওঠে। স্বাধীনতার পরবর্তী ২বছর কখনও অনাবৃষ্ট, কখনও অতিবৃষ্টির কারণে ফসলহানি ঘটে। এছাড়া পুনর্গঠনের জরুরি সময়ে বিরোধী রাজনীতির নামে সশস্ত্র ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটিয়ে অর্থনীতিকে নাজেহাল করে তোলে। এর পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গোপন ষড়যন্ত্রের বহুমুখী নাগপাশে দুর্ভিক্ষের কালে ছায়া নেমে আসে ১৯৭৪ সালে। লেখক ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ধানের উৎপাদন ও চাল মজুদের তথ্য প্রদান করে দুর্ভিক্ষের সময়ের প্রকৃত অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র – কিউবার মধ্যে আন্তবিরোধের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশে খাদ্যশস্য না পাঠানোর কারণ ও এটির প্রতিক্রিয়া সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দুর্ভিক্ষকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর সরকার সাড়ে চার হাজর ইউনিয়নে ৫৭৫৭ টি লঙ্গরখানা খোলা হয় এবং সেখানে নিয়মিত খাদ্যদ্রব্য, ওষুধপত্র ও বস্ত্র সরবরাহের জন্য গাড়ি, লঞ্চ, বিমান ও হেলিকপ্টারে খাদ্যশস্য ও অন্যান্য ত্রাণসামগ্রী পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়। দুর্ভিক্ষের সময় বঙ্গবন্ধু ভাতের বদলে রুটি খেতেন এই বলে,’ ‘দেশের জনগন ভাত পাচ্ছে না, আমি ভাত খাব কোন অধিকারে!’

ষষ্ঠ অধ্যায়ে অধ্যায়টি অতি সংক্ষিপ্তভাবে লেখক বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব অর্থাৎ বাকশাল গঠনের প্রেক্ষাপট, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে সম্পর্কে তুলে ধরেছেন। এছাড়া বঙ্গবন্ধুর হত্যকান্ডের বিষয়টিও উঠে এসেছে তাঁর লেখাতে। এ বিপ্লবের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশের সর্বস্তরের জনগনের ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত উদ্যম সৃষ্টির মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে তা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। এছাড়া দ্বিতীয় বিপ্লবের বেশিষ্ট্য সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে এবং ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় স্পষ্টভাবে ধারণা প্রদান করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার মাধ্যমে কেবল দ্বিতীয় বিপ্লবকে হত্যা করা হয়নি, সেই সাথে হত্যা করা হয় গণতন্ত্রকে।

পরিশেষে হাসান মোরশেদ তাঁর বইটিতে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু সরকারের কার্যাবলীকে অতি সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। বলা যায় অল্পের মধ্যে তিনি সকল বিষয়ই তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি বইয়ের গ্রন্থপঞ্জিতে মোট ১৮টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছে, যেগুলো খুবই তথ্যবহুল। তবে তিনি তাঁর বইয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমহের তথ্যসূত্র ব্যবহার করেন নাই, যেটি করলে এ বিষয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করতে সুবিধা হতো। তাছাড়া তিনি তথ্যের সন্নিবেশ ঘটানোর জন্য পেপার কাটিং ব্যবহার করেছেন, যেটি বইটিকে অনন্য মাত্রা দান করেছে। হাসান মোরশেদ এর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ নির্মাণ বইটি ২০১৮ সালে প্রকাশ করেছে ‘চর্চা’ প্রকাশন। ১০৩ পৃষ্ঠার বইটির মূল্য রাখা হয়েছে ২৫০ টাকা।

 

মো. রিয়াদ হোসেন

শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধ স্টাডিজ বিভাগ

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Sharing is caring!



এই বিভাগের আরো খবর...