24 November- 2020 ।। ১০ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ ।। দুপুর ১২:০২ ।। মঙ্গলবার

বগার শিং এর খোঁজে

মো: সোলাইমান হোসেন :  আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সেকেন্ড টাইম কাশ্মীর যাওয়ার তাই দশদিনের প্রস্তুতির জন্য নিয়েছিলাম জামাকাপড় রেইনকোর্ট ও মাছ ধরার সরঞ্জাম প্রায় তিন কেজি+ এর মতো ও অন্যান্য জিনিসপত্র যেমন- কার্বলিক এসিড, ওডোমস, সুইসুতা, ছুরি, মাছ মাংসের রেডি মসলা, কংফু লিকুইড, গুল, ফার্স্ট এইড ঔষধ, হালকা কিছু শুকনা খাবার ইত্যাদি l আমরা কোন ট্যুরের মিনিমাম বিশ-ত্রিশ দিন আগে থেকেই প্ল্যান তৈরী করি কুষ্টিয়াতে আমি আর ঢাকাতে দুই জন এই মোট তিন জনের রাতে কনফারেন্স হয় প্রায় প্রতিদিনই এক ঘন্টা থেকে তিন ঘন্টা পর্যন্ত এ আলোচনা চলে এ যেন তিন জনই পেস্টেল ও কার্টিজ পেপারে আঁকতে থাকি অদ্ভুত এক আদিম ভালোলাগা যার প্রতিটা সেল উন্মুখ হয়ে থাকে নতুনত্বকে দেখার ছোঁয়ার ও ভীন্ন  স্বাদের খোঁজে l

ভোরে কেরানির হাট নেমে একটা খাবার হোটেলে ঢুকলাম ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে চায়ের অর্ডার করলাম l শাওনের একটা ফ্রেন্ড আছে কুষ্টিয়াতেই বাসা এখানে একটা কোম্পানিতে জব করে পরিতোষ, তার সাথে আগেই কথা হয়েছে ওর ওখানে যাবো এবং গেলামও কিন্তু প্রায় বারোটা পর্যন্ত সময় কেটে গেলো lবান্দরবান বলতে শুনেছি চিম্বুক নীলগিরি۔۔۔যা খুব সাধারণ পর্যটন কেন্দ্র, তাই আলোচনা করছি কোথায় যাওয়া যায়۔۔۔এর মধ্যে তৌফিক ভাই তার এক কলিগকে কল দিলো এবং সে বগা লেক যাওয়ার পরামর্শ দিলো l তারপর কেরানির হাট থেকে CNG নিয়ে বান্দরবানের পথে রওনা দিলাম শুরুতে সমতল হলেও কিছুক্ষন পর শুরু হলো হালকা টিলার মতো উঁচু নিচু ঢেউ খেলানো রাস্তা….যা আগের পেন্সিল দিয়ে আঁকা মাইন্ড সেটকে রাবার দিয়ে হালকা ভাবেই মুছতে শুরু করলো(মূলত, দার্জিলিং ঘুরে আসার পর বান্দরবানকে নিছক একটা সাধারণ পাহাড় মনে হতো যা ছিলো রীতিমতো চরম অন্যায় চিন্তা তা এখন বুঝতে পারছি)l যদিও ঘন্টা খানিকের পথ তবুও এক অচেনা ভালোলাগা শুরু হলো۔
যাই হোক জীবনে প্রথম বারের মতো বান্দরবান  পৌঁছলাম l

একদম ভরদুপুরে এসে মনে হলো যেন যানবহন শূন্য পাহাড়ের মাঝে কেউ পাগলামি করে একটা  স্ট্যান্ড বানিয়ে রেখেছে l এখানে সকাল সাতটাই বাস(মুড়ির টিন)ছেড়ে যায় রুমার উদেশ্যে ভাড়া জনপ্রতি 200/- l
বারোটার আগেও সম্ভবত একটা বাস ছিল কিন্তু আমরা পৌঁছেছি প্রায় বেলা একটার দিকে l
একটা খাবার হোটেলে গেলাম দুপুরের খাবারের অর্ডার করলাম ও হোটেল ম্যানেজারের কাছে জানতে চাইলে সে বললো এতো দেরিতে সাধারণত টুরিস্ট খুব কম যায় তবুও আপনারা চাইলে চান্দের গাড়ি অথবা CNG নিয়ে যেতে পারেন l
শাওন আবার গাড়ি খোঁজা ও ভাড়া মেটানোই দারুন এক্সপার্ট۔۔۔ও একটা CNG 1800/- রুমা পর্যন্ত রিজার্ভ করে আনলো তাতেই যাত্রা শুরু হলো ll
পাহাড়ের একপাশের গা ঘেঁষে রাস্তা তৈরী করা অপর পাশের ভিউ বলে বোঝানো কঠিন যে এতো ঘন কালো সুন্দর আমাদের দেশের প্রাণ ভরানো এমন পাহাড় মেলা আছে! ۔۔۔কখনো সর্পিল, কখনো আঁকাবাঁকা সাথে বিশাল উঁচুনিচু তো আছেই
ভীষণ মন ভোলানো বাতাস সাথে পাহাড়ের গায়ের এক আদিম অদ্ভুত গন্ধ নিয়েই চললাম l
রুমার ঠিক কয়েক কিলো আগে পাহাড় ধ্বসে রাস্তা প্রায় বন্ধ, তার ওপর আবার CNG এর ছোট চাকা তবুও আমরা বদ্ধ পরিকর এর শেষ দেখার নেশায় গাড়ি থেকে নেমে তিন জন পেছন থেকে প্রানপনে ধাক্কা তৌফিক ভাই তো মজাই একটু চোট পেয়েই বসলো তবুও ধাক্কা আর ধাক্কা, আবার পথ চলা۔۔۔ এভাবেই প্রায় 4-4:30 মিনিটে রুমা পৌঁছলাম l
তৈফিক ভাই এর আগেই তার কলিগের থেকে রুমার গাইড আপেল মল্লিকের ফোন নাম্বার নিয়ে তাকে কল করে ফর্ম রেডি করে রেখেছে l তো আমরা রুমা আর্মি ক্যাম্পে গেলাম পারমিশন নিতে(চার পাঁচ তলা উঁচু হবে রাস্তা থেকে)l

সেখানে রেজিস্টার নিয়ে দুই জন সেনা অফিসার বসে আছেন, আমাদের দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন এখন এই অসময়ে এতো পথ যেতে পারবেন আপনারা, রাত হয়ে যাবে তখন কী করবেন? আমরা সালাম দিয়ে বললাম জ্বী অবশ্যই পারবো! তবু তারা নারাজ হয়ে বললো আজ রুমাতে থেকে কাল সকালে যাবেন না হলে পথে কিডন্যাপের ভয় আছে!
আমরা তো নাছোড় বান্দা অনেক রিকুয়েস্ট করে অনুমতি নিলাম কারণ তৌফিক ভাইয়ের ছুটির বিষয় আছে l
আপেল চান্দের গাড়ি রিজার্ভ করলো সম্ভবত 12-15 শত হবে হয়তো এগারো গ্রাম পর্যন্ত, রুমা বাজারের পাশেই আপেলের বাসা ও বাসায় গেলো ব্যাগ আনতে আমি তৌফিক ভাইকে বললাম ও কেন যাবে আমাদের সাথে? বাংলাদেশে আবার গাইড নিয়ে ঘুরবো নাকি? সেও বললো বুজতেছি না!
যাই হোক আপেল এলে রওনা দিলাম বগার পথে l
কিছুদূর যেতেই আবার পুলিশের চেকপোস্ট, ওখানেও এন্ট্রি করে সেই একই পথে আবার শুরু হলো চলা۔۔ কিন্তু সে কী, এবার তো দেখছি ভাঙ্গা চোরা হেরিং রাস্তা আবার মাঝে মাঝে দুই তিন ফিট গর্ত সাথে বেশ খাড়া۔۔۔কী আজব দেশ আজব রাস্তা আপেল কিছু শব্দ বোমা মারলো রাস্তা মেরামত প্রসঙ্গে আর আমরা আছি ছাউনির রড ধরে নিজেদের গতর বাঁচাতে ব্যালান্স করতে,মাঝে মাঝে সেই ছোটবেলার রিং ঝোলার মতো ঝুলে থাকছি(বান্দরের লাহান) এর মধ্যে গাড়ির চাকা মাঝে মাঝেই ফেল করছে মানে কাদার মধ্যে বনবন করে ঘুরেই যাচ্ছে আর সাইলেন্সার পাইপের কালো ধোঁয়ায় ঐ কাঁদার উপর কালো দাগ হয়ে যাচ্ছে সাথে ঝাকুনি আর ধাক্কা আমরা তো একবার ভাবছিলাম গাড়ি থেকে লাফ দিবো কিন্তু ড্রাইভার ও আপেল বললো ভাই প্লিজ চুপ করে বসেন কিচ্ছু হবে না!
যাই হোক যত এগুচ্ছি ততই মুগ্ধ হচ্ছি এতো সুন্দর চারপাশ অচেনা ঝোপঝাড় অচেনা গাছ এতো অদেখা দূর শেষ সীমানা পাহাড় আর পাহাড়۔۔۔
পাহাড়ের গায়ে বুনো কলাগাছ আর বাঁশ۔۔۔
এগারো গ্রাম এর উপরে গাড়ি থেকে নামলাম যখন তখন ঠিক গোধূলীর প্রায় শেষ রঙের তুলির টান দেওয়া প্রায় শেষ যেই রঙীন শেষ আলো আমাদের দেখানোর জন্যে বসেছিল এবং বোঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে বাংলাদেশে পাহাড় ছাড়া কিছুই নেই l
নিচে ছোট্ট কয়েকটা ঘর মিলেই একটা পাড়া দেখা যাচ্ছে এখন শুধুই নামতে হবে প্রায় এক থেকে দেড় কিলো মতো۔۔ জীবনে প্রথম ট্রেকিং নামা দিয়েই শুরু হলো۔۔۔
একটানা কিছুক্ষন নামার পর হাঁটুর সামনের দুই অংশ কিছুটা কাঁপছিলো ভারী ব্যাগ ও দেহের চাপের কারণে l
শেষে এগারো গ্রামের পাড়াতে নামলাম, একটা টং ঘরে বসলাম l পাহাড়িরা অনেক আন্তরিক সাদামাটা ও সরল মনের, বিশেষ করে তাদের থেকে কিছু কিনতে গেলে বোঝা যায় l
চা খেয়ে ও রেস্ট নিয়ে বিশ মিনিট কাটিয়ে ফেলেছি কিন্তু আপেল মল্লিক(গাইড) বার বার  তাড়া দিচ্ছে ভাই অনেক রাত হয়ে যাবে প্লিজ দ্রুত চলেন l ঐ দোকানেই বাঁশের লাঠি ছিল(মুঠোর মধ্যে ধরা যায় এমন) ১০/-  পিছ, তিনটা নিলাম ও হাঁটা শুরু করলাম, আর শুরু হলো কল্পনার বগা পুকুরের এক বন পাহাড়ের গাঁয়ের পথে۔۔۔۔
কত অচেনা পোকামাকড়ের ডাক আর পথের দুই  ধারে ঘন ঝোপের ভেতর থেকে ব্যাঙের অদ্ভুত তাল মেলানো শব্দ যেন কানে এয়ার ফোন
লাগানো আর এস্ট্রিও সাউন্ড হচ্ছে۔۔۔
আমার ব্যাগ ছিল বিশাল ভারী, তাই ঘন্টা দেড়েক হাঁটার পরে পা আর চলে না তেমনি মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে ও অন্য হাতে লাঠি নিয়ে প্রানপনে ছুটছি۔۔۔
শেষ মেশ কমলা বাজারে পৌঁছলাম, উফফ l
জীবনে প্রথম বার সব কিছুই বিশেষ ভাবে মনের মাদার বোর্ডে পার্মানেন্টলি ইনস্টল হয় l
আমার আর শাওনের একই অবস্থা আর তৌফিক ভাই স্লিম তাই সে যথেষ্ট ফিট l
যাই হোক এবার শুধু ওঠার পালা যা ছিল এক তিক্ত অভিজ্ঞতা۔۔۔
রাত নয়টার একটু আগে বগা উপত্যকা জয় করলাম যা ছিল মাঝ নদীতে নৌকাডুবির পর একটা কাঠ ধরে ভেসে কিনারে আসার মতো অনুভূতি l চাঁদনী রাত ছিল তাই পাশে একটা বড় দীঘির মতো মনে হলো যার পাশেই আর্মি ক্যাম্প সেখান থেকে বেশ জোরেই ডাক দিলো কে আপেল মল্লিক নাকী?
আবার সেই সই স্বাক্ষরের ফর্মালিটি করে বগা পাড়ায় ঢুকলাম l
আপেল তার নির্ধারিত চুক্তি ভিত্তিক এক দোতলা কটেজে আমাদের নিয়ে গেলো, পুরো কটেজ ফাঁকা ছিল l এর নিচে খাবার ঘর আর উপরে থাকার ঘর করা তো আমরা উপরে উঠে রুমে গিয়েই গা এলিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষন শুয়ে থাকলাম l মাছ ধরার কথা মনে পড়তেই আবার চাঙ্গা হওয়া শুরু, শাওন বললো চল চার করে আসি, পরে চার নিয়ে বগা পাড়ে গেলাম দেখি শান বাঁধানো সিঁড়ি করা দারুন এক নিরিবিলি ঘাট۔۔۔জোস্নার আলোয় টলমলে বগা যেন কিছু বলতে চাইছে۔۔۔চারপাশে পাহাড় আর মাঝে কত শত বছরের পুরোনো রূপকথার গল্প সাজিয়ে তাকিয়ে আছে এই বগা লেক! ড্রাগন নিয়ে অনেক গল্পের খ্যাতিও কম নয়  বগার l যাই হোক চার করে আবার খাবার ঘরে ফিরলাম– বাঁশ ভাজি, ডিম ভাজি আর ডাল দিয়ে পাহাড়ি আঁঠালো চালের ভাত খেয়ে ওপরে রুমে  ফিরে আবার শুয়ে পড়লাম l
ঠিক বিশ বছর আগে আমাদের এলাকায় সন্ধ্যার পরে ইলেক্ট্রিসিটি না থাকলে যেমন মনে হতো ঠিক তেমন, এতটাই প্রাকৃতিক l নীরব নিঝুম বগা পাড়ে গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক গাঁও۔۔۔
কিছুক্ষন রেস্ট নিয়ে রাত বারোটার দিকে নামলাম লেক পাড়ে মাছ ধরতে l কোন স্টিক নেই শুধু সুতা বড়শি ভাড়া(সীসা) ও আটার টোপ এই নিয়ে  চাঁদের আলোয় বসে পড়লাম সেই স্বর্গীয় নিশ্চুপ শেওলা জলের ধারে l সীসার সাহায্যে বিশ-ত্রিশ হাত দূরে ছুড়ে বসে অপেক্ষা করছি۔۔۔এরই মাঝে অনুভব করলাম কিছু একটা আঙ্গুলে মৃদু ঝাঁকুনি দিচ্ছে তারপর আলতো করে টানতেই বুঝতে বাকি রইলো না কিছু একটা বেঁধেছে!!!!
টেনে কাছে নিয়ে আসার পর দেখি শিং মাছ!
বেশ মোটা ও বড় যা শিং এর সর্বোচ্চ সাইজ!
শাওনও পেলো একটা۔۔۔
অনুভূতি যে কত ভিন্ন সুখের স্বাদ দিতে পারে তা সময়ই বলে দিতে ওস্তাদ l অচেনা অদেখা প্রথম পাহাড় ট্রেকিং করে এমন সারপ্রাইজ পাবো তা ভাবতে গেলে বার বার আয়নার সামনে গিয়ে কপালটা দেখতে হবে!
তৌফিক ভাই কৌতুহলী হয়ে সেও আমার সুতা নিয়ে বসে পড়লো আনন্দের আবেগের প্রেমে পড়ে l
জোছনা এক নিশ্চুপ ভালোলাগার উপগ্রহ আর তা যদি এমন গভীর রাতে এমন পরিবেশে পায় তবে শত ক্লান্তি হাজারো শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায় l
যাই হোক۔۔সর্বমোট পাঁচটা মাছ পেলাম প্রায় একই সাইজের, এখন রান্নার পালা l লেকপাড়েই চাকু দিয়ে কেটে পরিষ্কার করে আগে থেকে রাখা কড়াইতে তেল আর রেডি মশলা মাখিয়ে পাশেই একটা ছোট্ট বাগানে ফ্রাই করা হলো l গরম শিং ফ্রাই নিয়ে গেলাম আমাদের কটেজের দুই তলার বারান্দায়۔۔۔যার সামনে উন্মুক্ত ছোট্ট একটা মাঠ, তা পেরিয়েই লেক তার ঐ পাশে পাহাড়ের মাথার উপরেই চাঁদ, রাত প্রায় তিনটা! আমরা তিনজন ছাড়া পৃথিবীর সব পাহাড় যেন কালো চাদর বিছিয়ে ঘুমিয়ে আছে l বারান্দায় বসে আমরা দূর পাহাড়ের দেশে আনমনে তাকিয়ে ভাবছি ভ্রমণ সুখের অনুভূতি কতইনা অতুলনীয়!!!!শেওলা খেয়ে বেড়ে ওঠা মাছ প্রকৃতির এক নেয়ামত যা মিষ্টি ও রসালো আর সাথে চাঁদের চাহনি۔۔۔!!!

Sharing is caring!



এই বিভাগের আরো খবর...