28 March- 2020 ।। ১৫ই চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ ।। রাত ৩:৪১ ।। রবিবার

একজন লড়াকু যোদ্ধা ফিরোজা বেগম

বঙ্গ রাখাল : নারীরাও যুদ্ধেগুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন কিন্তু এটা বলতে দ্বিধা নাই যে আমরা ইতিহাস থেকে বার বার তাদের অবদানের কথা স্বীকার না করে বরং তাদের অবদানকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছি।যুদ্ধের পর নারীরা হয়েছে সহযোগী আর পুরুষ হয়েছে বীর। তাদের বীরাঙ্গনা উপাধি দিয়েই আমরা আমাদের দায় শেষ করেছি । শত শত সন্তান তার মাকে,পিতা তার মেয়েকে হারিয়েছে । ধর্ষিত নারীর গগণবিদারী চিৎকারে স্তব্ধ হয়ে গেছে চারিপাশ । অথচ আজ ভুলতে বসেছি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের উপর নির্যাতন,ধর্ষণ,নিপীড়নের হৃদয়বিদারক গাঁথা ।অনেক ক্ষেত্রে নারী রেখেছে পুরুষের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অথচ এ নারীরাই আবার হয়েছে বারে বারে বঞ্চিত । মুক্তিযুদ্ধ বলতেই হয়তো আমরা ধরে নেই দুইটা দেশের সেনাদের মধ্যকার যুদ্ধ । আসলে এটা কোন সেনাদের যুদ্ধ ছিল না এটাছিল এদেশের সাধারণ মানুষের হাজার বছরের লড়াই সংগ্রামেরপরিসমাপ্তির এক জনযুদ্ধ । যে কারণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন এদেশের মানুষ মুক্তি চাই, এদেশের মানুষ বাঁচতে চাই ।পুরুষকে লড়তে হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনি ও এ দেশীও শত্রুদের বিরুদ্ধে আর একজন নারীকে লড়তে হয়েছে পরিবার, সমাজ,ধর্মীও পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা কোন সংগঠনের সাথে ।মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা কোন আকস্মিক ঘটনা না । এর পিছনে রয়েছে হাজার হাজার বছরের অবহেলা,নির্য়াতন,নিপীড়নের ইতিহাস । মুক্তিযুদ্ধে এই সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল তাদের সচেতন প্রয়াস । তেমনই একজন মুক্তিযোদ্ধা লড়াকু নারী ফিরোজা বেগম । যুদ্ধের সময় তার বয়স ঊনিশ বছর দশ মাস । স্বামী রুস্তম যুদ্ধে গেছে । কোলে নয় মাসের মেয়ে আফরোজা নাসরিন লিপি । বার বার রাজাকার বাহিনি তাকে নানা হুমকি ধামকি দিয়েছে তবে যে তাদের মধ্যে তাকে কেউ সাবধান করে নিরাপদ জায়গা চলে যেতে বলেনি তা নয় । কারণ এ অঞ্চলে যারা রাজাকারে নাম লেখিয়েছে তারা সবাই তার পরিচিত । যে কারণে তাকে মাঝে মাঝে সাবধানও করে দিয়েছে । কারণ পাকিস্তানিদের নজরে পড়লে তার কোন রক্ষা নেই । আবার কিছু কিছু রাজাকার এসব দেখে অন্য রাজাকারদের বলতো নিজের ভাইদের সাথে গাতদারী করতে পরবে না । রাজাকার ,পাকিস্তানি আর্মিরা তাদের টিন আর খড়ের ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে । সাতদিন ধরে গোলার ধান পুড়েছে । স্বামী ছিলেন ঝিনাইদহের মুক্তিযোদ্ধাদের কুরিয়ার । তিনি তাদের চিঠি পত্রের আদান প্রদান করতেন । ফিরোজা বেগম নিজে বর্ষার সময় পানি সাঁতরে জীবন বাঁচিয়েছেন । ততেদিনে শিখে নিয়েছেন আর্ম চালানো । নিজের কাছে সব সময় আর্ম থেকেছে । তিনিও মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজখবর নিয়েছেন । এই বিপদের সময় হিন্দুদের আমানত রক্ষা করেছেন । বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন এই নারী । চোখের সামনে পুড়তে দেখেছেন নিজের তিলে তিলে গড়ে তোলা সুখের সংসার আর যত্নে সাজানো ঘরের তৈজসপত্র । এমনভাবেই স্মৃতিচারণ করছিলেন ভারাক্রান্ত নয়নে । সে সময়ের কথা বলতে বলতে বললেন তখন না যতটা কষ্ট পেয়েছি তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি যুদ্ধের পর । সিপিবির দল বলে আমার স্বামীকে সিপিবি আবার রক্ষীবাহিনি বলে আমাদের বাহিনিতে যোগ দিতে হবে কিন্তু আমার স্বামী কোনদিনই অন্যায়কে মেনে নেয়নি । যে কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও যুদ্ধের পর তাকে বার বার বিভিন্ন দলের লোক ধরে নিয়ে গেছে ।কিন্তু আল্লাহর মহিমায় তিনি আবার বেঁচে এসেছে । পুলিশ দিয়েও সব সময় তার উপর অত্যাচার করা হয়েছে যা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাকে করা হয়নি । কোন জায়গা কিছু হলেই তাকে দোষ দেওয়া হতো এবং তাকে পুলিশ দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করা হয়েছে । এভাবেই নানাভাবে নিজের জীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তিনি আমাকে শোনাছিলেন এবং অশ্রুসিক্ত হয়ে যাচ্ছিলেন । তার কোন প্রত্যাশা নেই । আজ আমার সন্তানেরা মানুষের মত মানুষ হয়েছে । তারা স্বাধীন বাংলাদেশে জন্মেছে এটাই আমার অনেক পাওয়া । কিন্তু দুঃখের বিষয় কি জানো মাঝে মাঝে অনেক খারাপ লাগে । যখন দেখি যারা যুদ্ধের সময় বিরোধীতা করেছিল আজ তারাই বড় মুক্তিযোদ্ধা । এভাবেই নিজের মনে জমে থাকা সেই বিভৎসময় সময়ের কথা বললেন আর মুহূর্তের নিরবতার দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠল বাসার পরিবেশ ।

Sharing is caring!



এই বিভাগের আরো খবর...